পূর্ণ চাদের রাত আজ।সাদা কালো মেঘগুলো দ্রুত পার হচ্ছে চাদের নিচ দিয়ে। সব ‍দিকেই চাদের মায়াবী আলো। খোলা আকাশের নিচে  নিরব আর রিতু শুয়ে তাকিয়ে আছে চাদটার দিকে। মাটিতে শুয়ে আছে তারা। এক জনমানবহীন পাথারে। এই রাতে এখানে অন্য কারো কোন কাজ নেই। ‍পুরো পাথার জুড়ে শুধু এই দুজন মানুষেরই শ্বাস প্রশ্বাস।  এই রাতের সপ্নই দেখেছে নিরব এতোগুলো দিন ধরে। এ রাতের আশা করেই কত নির্ঘুম রাত পার করেছে সে। রিতুর ‍দিকে তাকালো নিরব। চাদ দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়েছে সে.. নিরব তাকে ডাকতে চাইলো না।জেৎস্নার আলোয় চাদ নিজেই যেন রিতুর সৌন্দর্যের কাছে চরমভাবে হেরে যাচ্ছে বারবার। রিতুকে ছেড়ে চাদ দেখা যে বড় ধরেনের বোকামী হচ্ছে তা উপলব্ধি করতে পারলো নিরব। ঘুমন্ত চেহারাটার দিকে পলকহীনভাবে তাকিয়ে থাকে সে। রাত গভীর হতে থাকে। কত চড়াই উতরাই পার করে সে নিজের করে পেলো রিতুকে, ভেবে অবাক হয় সে। 
.
নিরবের স্বভাবও নিরবই ছিল বরাবরই। পড়াশুনায় তার পারদর্শীতা ছোট থেকেই ব্যাপক। কখনো নিরব প্রেমে পড়তে পারে তা আগে ভাবেনি। অনার্স ২য় বর্ষে ফাইনাল পরীক্ষার আগে যেদিন নিরবের প্রাকটিক্যাল খাতাটা চেয়ে বসল রিতু, সেদিন থেকেই সবকিছু কেন জানি ওলট পালট হয়ে যাচ্ছিল । রিতুর সাথে সেটাই প্রথম কথা নিরবের। আগেও তো অনেক মেয়ের সাথে কারনে অকারনে কথা বলতে হয়েছে, তখন তো হয় নি এমন! নতুন কি ছিল এখানে?
নিরব প্রেমে পড়ে যায় রিতুর। অতি গোপনে ভালবাসতে থাকে সে রিতুকে। গোপন ভালোবাসাগুলো সাস্থের জন্য ভালো হয় না।   গোপন ভালোবাসাগুলো মানুষকে কুড়ে কুড়ে খেতে থাকে। পাগল বানিয়ে ‍দিতে থাকে। নিরবও তা বুঝতে পারলো। সিদ্ধান্ত নিল রিতুকে সে বলবে বিষয়টা। তারপর যা হবার হবে।
.  
রিতু মেয়েটা প্রচুর বাবা-মা ভক্ত। তাদের কথার বাইরে এক পা ও সে নড়বে না্। বিয়ে সে তাকেই করতে বাধ্য যাকে তার পরিবার পছন্দ করবে। তাই সে প্রেম পিরিতির মত রিক্স নিতে চায় না। পরে যদি কোন কারণে বিয়ে না করা যায় তাহলে সেটাকে নিজের হাতে দুঃখ টেনে আনা বলে মনে করে রিতু। তাই নিরবকে না-ই বলতে হয়েছে। 
নিরব এই ব্যার্থতা মেনে নিতে পারছিল না কোনভাবেই। সে যেন পাগল হয়ে যাচ্ছিল। তার রেজাল্টের অবনতি, পোশাক আশাকের অবনতি, চলাফেরার অবনতি সবাই খেয়াল করতে পারত। এখন শুধু রিতুকে তার চাই।
প্রতিদিন রিতুকে অনুরোধ করত নিরব, তাকে ভালবাসতে।  ব্যাপারটা বিরক্তির পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। নিরবকে রিতু অপছন্দ করত না। কিন্তু তার কার্যকলাপ অপছন্দ করতে বাধ্য করছে।
.
নিরব ছাদে বসে আছে। আকাশে ঝলমলে চাদ। চদের নিচ দিয়ে দ্রুত পার হয়ে যাচ্ছে সাদা কলো মেঘ। কি অমায়িক দৃশ্য। এমন এক রাতে সে আর রিতু মাথার নিচে দু হাত বেধে পাশাপাশি শুয়ে চাদ দেখতে থাকবে। কোন এক জনমানবশূণ্য প্রান্তরে। উফ্ ভাবতেই শিহরিত হলো নিরব। এই সপ্নের রাত সে কবে পাবে? রিতু কি তাকে কখনোই ভালোবাসবে না? কখনোই না? নিরবের চোখ চাদের আলোতে চিকচিক করে উঠলো।
একদিন রিতু তার বান্ধবীর থেকে এক অদ্ভুত খবর শুনল। কাল ক্যাম্পাসে গিয়েই এ বিষয়ে কথা বলবে সে নিরবের সাথে।
-এসব কি শুনছি নিরব?
-কি?
-তুমি নাকি কিসব খাওয়া শুরু করেছো্? এসব কি?
-তাতে কার কি যায় আসে রিতু? তোমার কিছু যায় আসে? তুমি কি আমাকে নিয়ে ভাবো রিতু? যদি ভাবোই তাহলে কেন স্বীকার করো না যে তুমি আমাকে ভালোবাসো ? কেন? রিতু, শুধুমাত্র তুমি বললে আমি এখন থেকেই সব কিছু বাদ দেব । তোমার চেয়ে বড় নেশা আমার কিছু নেই রিতু। আমার যত কষ্টই হোক আমি বদলে যাব। আবার আগের মত। অথবা তুমি যেমন চাও।
রিতু এসব কথার উত্তর খুজে পেল না। 
রাতে রিতু যখন শুয়ে পড়লো তখন খুব মনে পড়ছিল নিরবের কথাগুলো ।অপরাধ বোধ হচ্ছিলো। নিরব নামে একটা জীবন শুধুমাত্র তার জন্যই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অথচ সে একটু চেষ্টাও করছে না তাকে ভালোবাসার, তাকে ফেরানোর। নিরব ব্রিলিয়েন্ট ছাত্র, সে নিশ্চয়ই ভালো কিছুই করবে। রিতু যদি তার কথা বাবা-মা কে  বলে তাহলে তারা মেনে নিতেই পারে। খুব কষ্ট হচ্ছিল রিতুর । এ কষ্টের উৎস কি?তার কি ভালোবাসা জন্মালো নিরবের প্রতি? হয়তো। নাহ্ আর এমন চলতে দেয়া যায় না।
.
-নিরব।আমি অনেক ভেবেছে কাল রাতে। তোমাকে নিয়ে।
অবাক আর উচ্ছলতা নিয়ে রিতুর ‍দিকে তাকায় নিরব।
-সত্যি? তুমি আমাকে নিয়ে ভেবেছ রিতু? সিত্যি?
-শোন। এত খুশি হওয়ার কিছু নেই। এখনো কিছুই হয় নি। 
অভিমান টাইপের বিরক্তি নিয়ে বললো রিতু। 
-তুমি ভদ্র হয়ে যাও নিরব। অাগের মত। এসব খাওয়া ছাড়। চুল ঠিক করে চলাফেরা করো। পারবে?
-আমি যদি পারি তাহলে কি হবে?
-তাহলেই ‍তুমি অামাকে পাবে। 
-অামাকে এক সপ্তাহ সময় দাও রিতু। 
.
সত্যিই রিতুর চেয়ে বড় নেশা নিরবের কাছে কিছুই নেই। নিরব তার আগের দুনিয়াতে ফিরে এলো। সে বুঝতে পারলো যে কোন কারণেই তার ওই অন্ধকার দুনিয়াতে পাওয়া ঠিক হয় নি। সে জগৎ ধ্বংসের জগৎ। 
সে দিনের কথোপকথনের পর রিতুর সাথে কথা হয় নি। কারণ ক্যাম্পারে যায়নি নিরব । সপ্তাহ শেষে সবাইকে চমকে দিতে চায় সে। 
একদম আগের বেশে নিরব কাল ক্যাম্পাসে যাবে।রাতে ছাদের উপর বসে তারই পুঙ্খানুপুঙ্খ প্লান করছে নিরব। সোহেল ফোন দিল । 
-কিরে নিরব। ক্যাম্পাসে আসিস না কেন?
-কাল যাবো। 
-ও আচ্ছা। শুনেছিলাম অামাদের রিতুকে পছন্দ করতি। ওর তো আজই বিয়ে হচ্ছে। 
-সত্যি? 
-একদম । হঠাৎ করেই কেন জানি। 
-ওও আচ্ছা। হোক। ঠিক আছে কাল দেখা হচ্ছে।
নিরব কারো সাথে মিশত না।সোহেলও খুব ভালো বন্ধু নয় । তাই তার কাছে আবেগ প্রকাশ করতে চাইলো না নিরব। বুঝতে দিল না যে রিতু তার কাছে কি? কিন্তু রিতু সত্যিই একাজ করছে? তার দেওয়া কথা সে এভাবে ভুলে গেল? ছাদ থেকে লাফ দিলে কেমন হয়? চিৎকার দিতে ইচ্ছে করছে খব। কিন্তু নিরব এই এক সপ্তাহে অনেক কিছুই শিখেছে। সে মেনে নিবে সবকিছু। 
.
দুই মাস হলো বিয়ে হয়েছে রিতুর। সব মিলে সে ভালোই আছে। মাঝে মাঝে নিরবকে দেওয়া কথা তার মনে পড়ে কিন্তু কিছু করার নেই । সবকিছু এত তাড়াতাড়ি হয়ে গেছে যে তার কিছু করারও ছিল না।  বিয়ের পর তার ক্যাম্পাসে যাওয়াও বন্ধ হয়েছে। তাই নিরবের সাথে  আজ পর্যন্ত কোন যোগাযোগ নেই।ফোন নম্বর বা অন্য কোন যোগাযোগ মাধ্যমও পরস্পরের জানা ছিল না। জানলেও কি বা হতো। রিতু পরবর্তীতে অবশ্য খবর পেয়েছিল যে নিরব একদম আগের মত হয়ে গেছে। তার রেজাল্টও আগের মত। রিতু আশা করে সে সব সামলে নিয়েছে। 
মার্কেট থেকে একা একা আসার সময় রিক্সায় বসে এসব ভাবতে থাকে  রিতু।আজ অনেক রাত হয়ে গেছে ফিরতে।  পৌছে গেছে রিক্সা। রিক্সা ভাড়াটা দিয়ে বাড়ির গলিতে ঢুকলো সে। ৫ মিনিট যেতে হবে গলি ধরে। 
-কেমন আছো রিতু?
পিছনে ফিরে দেখতেই আশ্চর্য হলো রিতু।রোড লাইটের হালকা আলো, কিন্তু নিরবকে চিনতে সময় লাগলো না।চিনে লাভ হলো না। কিছু বলার আগেই কেন জানি জ্ঞান হারালো রিতু।
.
পূর্ণ চাদের রাত আজ।সাদা কালো মেঘগুলো দ্রুত পার হচ্ছে চাদের নিচ দিয়ে।হ্যা, আজই সে সপ্নের রাত।যে রাতের সপ্ন দেখতো সে রিতুকে নিয়ে।আজ তা পূরণ হয়েছে।
 রাত অনেক হয়েছে। বৃষ্টিও আসবে মনে হচ্ছে। খোলা অকাশের নিচে তাও আবার এই নির্জন পাথারে আর থাকা উচিৎ নয়। রিতু এখনো ঘুমোচ্ছে। তাকে ডাকা উচিৎ। কিন্তু ডাকলো না নিরব। হাতের ছুরিটা অনেক দূরে নিক্ষেপ করলো সে। এই ছুরিটা দিয়েই ঘুমিয়ে দিয়েছিল সে রিতুকে। রিতুর গলা থেকে গলগল করে বের হওয়া রক্তগলো নিরবের গায়ের নিচে এসেছিল শুয়ে থাকার সময়। তাই শার্টটাও সে ছুড়ে ফেলতে যাবে তখনি মনে পড়লো, ঘুমিয়ে দেওয়ার আগে কত আকুতি মিনতি করেছিল রিতু জেগে থাকার জন্য এই শার্টটা ধরে, পা ধরে।কিন্তু তাতে কি?নিরবের সপ্নেরও তো একটা দাম আছে। তার সপ্ন তো তাকে পূরণ করতেই হবে।
নাহ্, ভালোবাসার মানুষের স্মৃতিবিজরীত শার্ট এটা। এটা ফেলে দেওয়া যায় না। শার্টটা সাথে করেই নিয়ে যাবে নিরব। যতই রক্ত লাগুক, তার ভালোবাসার মানুষের কথা মনে করে ‍দিতে থাকবে এটা জীবনভর। 
রিতুর নিথর দেহটাকে “ভালো থেকো” বলে অনেক দূরের এক কৃত্রিম আলোর দিকে হাটতে শুরু করলো নিরব। বৃষ্টি এলো হঠাৎ। সবকিছু ধুয়ে মুছে যেতে থাকলো।কিন্তু শার্ট থেকে রক্তগুলো কেন জানি যাচ্ছে না।…
.
লেখকঃ Zahid Iqbal​