গোসলের মাঝখানে মধ্যবয়স্ক ফরিদ সাহেব মুখের মধ্যে কি যেন অনুভব করলেন। চুলের মতো মনে হচ্ছে। জিহ্বায় হাত দিয়ে তিনি অবাক হলেন। টেনে বের করলেন এক লম্বা চুল। আরো অবাক হলেন যখন দেখলেন চুলটা অস্বাভাবিক লম্বা। চুল টানছেন অথচ গলা থেকে অপর প্রান্তটা এখনো বের হয়নি। ভ্রু কুচকে গেলো ফরিদ সাহেবের। নিজের মধ্যে ভয়ের অস্তিত্ব খুজে পেলেন তিনি। উত্তেজনায় জোরে জোরে টানছেন তিনি। এক হেচকা টানে অপর প্রান্তটা বের হলো। শ্বাস প্রশ্বাস তীব্র হয়েছে। গোসলখানার ভেজা মেঝেতে ফেলা চুলটার দিকে দাড়িয়েই তাকিয়ে আছেন তিনি। চুলটা প্রায় ৩ মিটারের মত লম্বা। একটা মেয়ে মানুষের লম্বা চুলের চেয়েও অনেক বড়। তাছাড়া এটা তার পেটেই বা কিভাবে আসলো!!
.
সকাল বেলার এই ঘটনা ফরিদ সাহেবকে ততক্ষণ গভীরভাবে ভাবালো যতক্ষন না তিনি জনস্রোতে হারিয়ে গেলেন।শিক্ষক মানুষ তিনি। শিক্ষক হিসেবে যতটা তার সুনাম, তার চেয়ে বেশী সুনাম একজন ভালো মানুষ হিসেবে, সমাজ সেবক হিসেবে, সুবিচারক হিসেবে। গ্রামের যেকোন বিচার শালিশ ফরিদ সাহেবকে ছাড়া সম্ভব নয়। এই গ্রামের লোকজনের মানুষজনের মধ্যে যে মানসিক উন্নতি তার পেছনে ফরিদ সাহেবের অবদান সবাই স্বীকার করে। কারো সাথে তার দ্বন্দ নেই।
বেশী জনপ্রিয়তার জন্যই একা থাকার সময়টা খুব কমই পান তিনি। সকাল বেলার ঘটনাও তাই তিনি মনেই করতে পারেন নি সারাটাদিন। অনেক রাতে ঘরে ফিরে খাবার খেয়ে যখন শুয়ে পড়লেন তখনেই মনে পড়ল সকালের ঘটনাটা। শিহরিত হলেন তিনি। শিহরিত হবার মতই ঘটনা।ওলট পালট অনেক চিন্তাও মাথায় আসতে থাকে ফরিদ সাহেবের। আচ্ছা, চুলটা এত লম্বা কেনো? ওটা কি আসলে চুলই ছিল? নাকি অন্য কিছু। মানুষের চুল এত লম্বা হয়?? আচ্ছা ওটা কি মানুষেরই চুল?
.
আবার সকাল হলো, ফরিদ সাহেব আবার ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ভুলে গেলেন। ইদানিং চেয়ারম্যান সাহেবের মেয়ের ব্যাপারটা নিয়ে পুরো গ্রামটাই মানসিক ব্যস্ততার মধ্যে আছে। এখানে ওখানে নানান কথা। এই সমস্যার সমাধানের ক্ষেত্রেও ফরিদ সাহেবের মুখের দিকে চেয়ে আছে গ্রামবাসী। এটাই স্বাভাবিক। আরো একটা আলাদা কারণ আছে তা হলো মেয়েটাকে ফরিদ সাহেব নিজে পড়াতেন।
.
এখন থেকে দিন সাতেক আগে চেয়ারম্যানের মেয়ে রুপা লাপাতা হয়ে যায় হঠাৎ করেই। এক নিকট-আত্মীয় অসুস্থ হওয়ায় চেয়ারম্যান সাহেব আর তার স্ত্রীর সেখানে যাওয়া বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। রুপা পরীক্ষার পড়া আছে অযুহাত ধরে বাবা-মার সাথে যেতে চায় না। ওনারাও মেয়ের যুক্তিসঙ্গত কথা শুনে মেয়েকে একা বাসায় রেখে চলে যান। এ অার তেমন কি, দুপুরে যাচ্ছেন, অার রাতেই ফিরবেন তারা। কিন্তু তারা চলে যাওয়ার পর কি ঘটেছে তা একমাত্র ফরিদ সাহেবই কিছুটা হয়তো বলতে পারেন।কারণ বিকেলে তারই রুপাকে পড়াবার কথা। তাই রাতে চেয়ারম্যান সাহেব আর স্ত্রী বাসায় ফিরে যখন রুপাকে বাসায় পেলেন না তখন ছুটলেন ফরিদ সাহেবের কাছে। ফরিদ সাহেব তখন জমজমাট বাজারে লোকজনের সাথে বসে গভীর কোন বিষয়ে কথা বলছেন অার চা খাচ্ছেন। চেয়ারম্যান সাহেবের কথা শুনে ফরিদ সাহেব সহ সবাই বিষ্মিত হলো। তবে ফরিদ সাহেব আজ রুপাকে প্রচুর অমনোযোগী দেখেছেন। রুপা কোন কিছু নিয়ে তাড়াহুড়ার মধ্যে ছিল । পড়াতে গিয়েই রুপাকে কাপড় গুছাতে দেখেছেন ফরিদ সাহেব। স্বাভাবিক আবহাওয়াতেও খুব ঘামছিল সে। তখন এসব ব্যাপার কিছু মনে করেন নি ফরিদ সাহেব।কিন্তু এখন বুঝা যাচ্ছে। রুপা কারো সাথে পালিয়েছে। গ্রামে এধরনের ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে।বুদ্ধিমান ফরিদ সাহেব রুপার বাবাকে বললো যাতে রুপার সব খাতা কলম ফরিদ সাহেবকে দিয়ে দেয় । তিনি সব খাতা খুটে খটে দেখবেন কোন তথ্য সেখান থেকে পাওয়া যায় কি না। তিনি জানেন নাইনে পড়া ছেলেমেয়েদের খাতা ঘাটলেই তাদের চিন্তা চেতনা সহ বহু ঘটনা পাওয়া যায়।
ঘটনার তিন দিনের মাথায় ফরিদ সাহেব সব রহস্য সমাধান করে চেয়ারম্যান সাহেবকে জানালেন। খাতা থেকে যা জানা গিয়েছিল তা হলো এই যে, কোন একটা ছেলে যে এই গ্রাম থেকে বহুদূরে থাকে। সে ছেলে এই গ্রামে ঘুরতে এসে রুপার সাথে পরিচয় হয়। এবং ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তাদের একসাথে নদীপথে পালানোর কথা ছিল যা তারা বাস্তবায়ন করেছে ফরিদ সাহেব পড়িয়ে চলে আসার পরেই।
সবকিছুই যুক্তিসঙ্গতই দেখলেন চেয়ারম্যান সাহেব। তার বাড়ির পেছনে অদূরেই নদী। আর সন্ধ্যায় সেই নদীতে কেউ গেলে কেউ জানতেই পারবে না। নির্জন জায়গাটা সন্ধ্যায় অারো নির্জন হয়ে ওঠে।
.
অনেক চতুরতার সাথে পালানোর কারনে চেয়ারম্যান সাহেব খুজে বের করার কোন ক্লু পেলেন না। ছেলেটি কে ছিল তা জানলেও না হয় হতো। তাঝ থানায় জিডি করা ছাড়া আর কিছু করার নেই।
.
দিন যাচ্ছে আর রুপার চিন্তা জনসাধারণ কমিয়ে দিচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে এসব চলেই যায়। কিন্তু গত কয়েক দিন আগে থেকে ফরিদ সাহেব প্রতি রাতে ভয়ংকর সব সপ্ন দেখে চলেছেন। দিন দিন সপ্নটা ক্রমশ ভয়ংকর হচ্ছে। তবে এসবের উৎপত্তি হয়েছিল গোসলখানার ঘটনাটার মাধ্যমে তা ফরিদ সাহেব বুঝতে পারেন।
একদিন তিনি সপ্নেও দেখলেন মুখ থেকে চুল বের হচ্ছে। তিনি টানছেন চুলটা কিন্তু চুলের শেষ মাথা বের হচ্ছে না, আরো টানছেন, আরো টানছেন, উফ কি অস্বস্থিকর। ভয় আর বিরক্তিতে জর্জরিত হয়ে গায়ের জোরে তিনি চুল টানছেন, কিন্তু শেষ নেই। ঘুম ভেঙে যায়। খেয়াল করেন ঘামে কাপড় একদম ভিজে গেছে। শ্বাস প্রশ্বাস প্রচুর জোরে জোরে হচ্ছে আর ভয়। এ সপ্নের মানে কি?
ভয়টা গ্রাস করে ফেলে ফরিদ সাহেবকে ভালোভাবেই। জ্বরে পড়ে যান তিনি।
পরের দিন সপ্নে দেখলেন একটা মাত্র চুল তার গলা পেচিয়ে ফেলেছে আর শ্বাস নেওয়া যাচ্ছে না। চুল ছাড়ানোর জন্য হাত পা ছুড়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু কোন লাভ হয় না। ঘুম ভেঙেও খেয়াল করেন তার শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। ফরিদ সাহেবের এমন সুঠাম দেহ দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে।জনস্রোত এখন তাকে এসব চিন্তা থেকে দূরে রাখতে পারছে না।লোকজনের সাথে থাকতে আগের মত তার আর ভালো লাগে না।
একসময় এমন পরিস্থিতি তৈরী হলো, রাতকে ফরিদ সাহেবের দুর্বিষহ মনে হতে লাগলো। তিনি ঘুমাতে ভয় পেতে লাগলেন।
রাত হলেই তার চেহারায় অাতংক লক্ষ্য করা যেত।
স্বামীর এমন দরাবস্থা সহ্য করতে না পেরে মসজিদের ইমাম সাহেবের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন ফরিদ সাহেবের স্ত্রী। ফরিদ সাহেবও না করার মতো অবস্থাতে নেই। যেকোন উপায়ে তিনি এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে চান।
.
ইমাম সাহেব সব ঘটনা শুনলেন মনোযোগ দিয়ে। বেশ চিন্তার ব্যাপার। বারবার একই রকমের ভয়ানক সপ্ন নিশ্চয়ই কোন অর্থ আছে। অনেক চিন্তার পর ইমাম সাহেব আগামীকাল তার এক শিক্ষকের কাছে ফরিদ সাহেবকে যেতে বলেন। তিনি অনেক বড় বুজুর্গ ব্যাক্তি। তিনি হয়তো কোন সমাধান দিতে পারবেন।
রাতে ইমাম সাহেব বুজুর্গকে ফোনে ফরিদ সাহেবের ঘটনাগুলো বর্ণনা করেন। ঘটনা শুনে বুজুর্গ ইশার নামাজ পড়ে তসবিহ পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়েন। অনেকদিন বুজু্র্গ কোন সপ্ন দেখেন না। আজ তিনি সপ্ন দেখছেন।
কোন এক মেয়ে একলা ঘরে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছে।তার বাবা মা বাড়িতে নেই। কোথায় জানি গেছে। যাবার সময় বাইরের দরজাটাও খুলে রেখে গেছে। এক লোক হঠাৎ বাড়িতে ঢুকে পড়ে। বাড়িতে তেমন কারো উপস্থিতি না দেখে দূরে দাড়িয়ে মেয়েটাকে দেখতে থাকে। মেয়েটা যখনি বুঝতে পারে দূরে কেউ দাড়িয়ে আছে, তখনই তাড়াহুরো করে উঠে বসে, নিজের কাপড় ঠিক করে নেয়। আর বলে ওঠে
-আসেন স্যার, বসেন।
স্যার পড়ার টেবিলে বসেন আর কি যেন চিন্তা করতে থাকেন। অন্য ঘর থেকে মেয়েটা দরকারী বই-খাতাগুলো নিয়ে এসে টেবিলে বসে। মেয়েটিকে কি যেন লিখতে দিলো স্যার। আজ কেন জানি মেয়েটার অস্বস্থি লাগছে। স্যারকে কেমন জানি অচেনা লাগছে। লিখতে লিখতেই স্যার মেয়েটির থেকে জেনে নিল তার বাবা মা কোথায় গেছে, কখন আসবে।তারপর লেখা শেষ না হতেই হঠাৎ মেয়েটির হাত ধরে ফেলে স্যার। খুব শক্ত করে। মেয়েটিকে খেলনা পুতুলের মত করে বিছানায় ফেলে দেয় স্যার। মেয়েটার অাশ্চর্য হবার অন্ত থাকে না। যখনি সে চিৎকার করতে যাবে তখনি মুখ চেপে ধরেন স্যার। চলতে থাকে জঘন্যতম নির্যাতন। স্যার সতর্কতার সাথে মুখ চেপে ধরেছিলেন সবটা সময়ই। চোখের বেয়ে পড়া পানিগুলোর কিছু অংশ সেই শক্ত হাতেও লেগেছিল। কিন্তু হাতটা তার পরোয়া করে নি। মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে যায় একসময়। প্রয়োজন শেষে স্যার ভাবতে থাকেন তার পরিণতির কথা যদি মেয়েটা তার বাবাকে সব জানায়!! স্যার বুদ্ধিমান। তাই কোন রিস্ক তিনি নিতে চান না।
অজ্ঞান থাকা অবস্থায় মেয়েটাকে মেরে ফেললে কেমন হয়? কিন্তু আশেপাশে একাজের উপযোগী কোন যন্ত্র চোখে পড়ার অাগেই চোখে পড়লো মেয়েটার চুলগুলো। অনেক সুন্দর চুল মেয়েটার। প্রচুর লম্বা। কোমড় থেকেও এক হাত নিচে পড়বে হয়তো। এই চুলগুলো দিয়ে গলা পেচিয়ে ধরলো স্যার। শক্ত করে।আর শ্বাস নিচ্ছে না মেয়েটা। আর নিবেওনা।এরিমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে।বাড়ির পেছনের রাস্তা দিয়ে নদীতে গেলে কেউ টেরও পাবে না। নির্জন জায়গা। অন্যঘর খুজে একটা দড়ি আনলো স্যার।লাশটা যেনো নদীতে ভেসে না ওঠে তার ব্যাবস্থা করতে হবে। কোলে করে নিয়ে নদীর পাড়ে লাশটা নামালো। দড়ির এক প্রান্তে একটা বড় পাথর আর অন্য প্রান্তে মেয়েটার চুলগুলো খুব শক্ত করে বাধলো স্যার। গড়িয়ে দিলো মেয়েটাকে।
ঘুম ভেঙ্গে গেলো বৃদ্ধ বুজুর্গের।
.
ফরিদ সাহেব আর তার স্ত্রী বুজুর্গের ঘরে এসে পেছন থেকেই সালাম দেয়। বৃদ্ধ আস্তে করে পেছন ঘুরে বসে। ফরিদ সাহেবকে দেখেই হৃদয় কম্পিত হয় তার, চোখের কোণে পানিও চলে আসে।
ফরিদ সাহেবের চেহারাটা অাগেও দেখেছেন তিনি।
ফরিদ সাহেব অস্বস্থির কন্ঠে বলে ওঠেন-
-হুজুর, আমি কি করি? কিসের কি চুল! চুল তো আমারে বাইন্ধা ফেলছে।
-যে চুল তুই গলায় বাধছিস, তার থেকে তুই মুক্তি পাওয়ার অাশা করিস কেমনে!! অসম্ভব।
বিস্ফোরিত চোখ নিয়ে ফরিদ সাহেব তাকিয়ে থাকেন হুজুরের দিকে। সত্যকে না বলা যায় কিভাবে তাই হয়তো ভাবছেন তিনি।
.
লেখকঃ Zahid Iqbal



0 Comments